Plaster work বা প্লাস্টারের কাজ বলতে ইট, ব্লক বা কংক্রিটের তৈরি কাঠামোর ওপর সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণের একটি সমান আস্তরণ দেওয়াকে বোঝায়। এই আস্তরণ দেয়ালকে মসৃণ করে, আবহাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে এবং পরবর্তীতে রং বা টাইলস লাগানোর উপযোগী পৃষ্ঠতল তৈরি করে। বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পে সাধারণত ১২ মিলিমিটার থেকে ২০ মিলিমিটার পুরুত্বের প্লাস্টার ব্যবহার করা হয়, যেখানে ভেতরের দেয়ালে তুলনামূলক পাতলা এবং বাইরের দেয়ালে কিছুটা মোটা আস্তরণ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের আর্দ্র জলবায়ু এবং বর্ষাকালীন ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সঠিক প্লাস্টারের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মান অনুযায়ী কাজ না হলে দেয়ালে ফাটল ধরা, আর্দ্রতা প্রবেশ করা বা রং উঠে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তাই বাড়ি তৈরি বা সংস্কারের সময় প্লাস্টারের উপাদান, অনুপাত এবং কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।
প্লাস্টারের কাজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্লাস্টার শুধু দেয়ালের চেহারা সুন্দর করার জন্য নয়, বরং কাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়ানোর একটি অপরিহার্য ধাপ। ইটের গাঁথুনির ফাঁকগুলো প্লাস্টার দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে বাতাস বা পানি সরাসরি ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারে না।
একটি ভালো প্লাস্টারের আস্তরণ দেয়ালের ভেতরের কংক্রিট বা লোহাকে বাইরের আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বছরের বেশিরভাগ সময় বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা অনেক বেশি থাকে, সেখানে সঠিক প্লাস্টার ছাড়া দেয়াল দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। এর পাশাপাশি, ঘরের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের বিষয়টি পরিকল্পনা করার সময় দেয়ালের পৃষ্ঠতল মসৃণ হওয়া জরুরি, কারণ অমসৃণ দেয়াল আলো প্রতিফলনে বাধা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে প্রচলিত প্লাস্টারের ধরন
নির্মাণের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্লাস্টারের কাজ কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। বাংলাদেশে প্রধানত সিমেন্ট প্লাস্টার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
সিমেন্ট প্লাস্টার
এটি বাংলাদেশের আবাসিক ও বাণিজ্যিক সব ধরনের নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি। সিমেন্ট এবং বালুর মিশ্রণে এই প্লাস্টার তৈরি হয়। শক্তিতে ভালো এবং পানি প্রতিরোধী হওয়ায় বাইরের দেয়ালে এটি সবচেয়ে কার্যকর।
চুন প্লাস্টার
পুরোনো আমলের বাড়িতে চুন, সুরকি ও বালুর মিশ্রণে প্লাস্টার করা হতো। বর্তমানে এর ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তবে কিছু ঐতিহ্যবাহী সংস্কার কাজে বা বিশেষ ধরনের অভ্যন্তরীণ নকশায় এখনো চুন প্লাস্টারের ব্যবহার দেখা যায়। এটি সিমেন্ট প্লাস্টারের তুলনায় কিছুটা নমনীয় হয়।
জিপসাম প্লাস্টার
আধুনিক অভ্যন্তরীণ ফিনিশিংয়ের ক্ষেত্রে জিপসাম প্লাস্টার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এটি দ্রুত শুকায় এবং পৃষ্ঠতল অত্যন্ত মসৃণ হয়। তবে জিপসাম পানি সহ্য করতে পারে না বলে এটি কেবল ঘরের ভেতরের শুকনো দেয়ালে ব্যবহার করা উচিত। সাশ্রয়ী অভ্যন্তরীণ নকশা পরিকল্পনার সময় জিপসাম প্লাস্টার একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
ওয়াটারপ্রুফ প্লাস্টার
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা যেমন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা বা বরিশালে, যেখানে বাতাসে লবণের আধিক্য এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে সাধারণ সিমেন্ট প্লাস্টারে বিশেষ ওয়াটারপ্রুফিং যৌগ (compound) মেশানো হয়। একে ওয়াটারপ্রুফ প্লাস্টার বলে। ছাদের নিচের দেয়াল বা মাটির কাছাকাছি অংশেও এটি ব্যবহার করা হয়।
প্লাস্টারের মিশ্রণ অনুপাত
প্লাস্টারের মিশ্রণে সিমেন্ট ও বালুর অনুপাত কাজের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। সঠিক অনুপাত না মানলে প্লাস্টার দুর্বল হয়ে যায় বা দ্রুত ফেটে যায়।
| কাজের অবস্থান | সিমেন্ট : বালু অনুপাত | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ভেতরের দেয়াল | ১:৪ বা ১:৬ | মসৃণ পৃষ্ঠের জন্য ১:৪ ভালো, সাধারণ কাজে ১:৬ চলে |
| বাইরের দেয়াল | ১:৪ | আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবেলার জন্য বেশি সিমেন্ট দরকার |
| ছাদ বা সিলিং | ১:৩ | মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে ধরে রাখতে শক্তিশালী মিশ্রণ লাগে |
| মেরামতের কাজ | ১:৩ | ছোটখাটো ফাটল বা ভাঙা জায়গায় শক্ত মিশ্রণ ব্যবহৃত হয় |
বালু অবশ্যই পরিষ্কার এবং ধোয়া হতে হবে। বালুতে কাদা বা পলি থাকলে প্লাস্টারের সাথে দেয়ালের বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সিলেট বালু বা স্থানীয় নদীর বালু ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টারের জন্য মিহি বালু বেশি উপযোগী।
প্লাস্টারের কাজের ধাপসমূহ
প্লাস্টারের কাজ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে না করলে চূড়ান্ত ফলাফলে ত্রুটি দেখা দেয়। নির্মাণ শুরুর আগে যাচাই করার সময় প্লাস্টারের প্রস্তুতির বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা উচিত।
পৃষ্ঠতল প্রস্তুত করা
প্লাস্টার করার আগে দেয়ালের পৃষ্ঠতল পরিষ্কার করতে হয়। ইটের গাঁথুনিতে কোনো আলগা অংশ, ধুলো, বা তেলের দাগ থাকলে তা ঘষে তুলে ফেলতে হয়। ইটের ফাঁকগুলো (joints) প্রায় ১০-১২ মিলিমিটার গভীর করে খোঁড়া থাকলে প্লাস্টার ভালোভাবে আটকে যায়।
পানি দেওয়া (Curing the surface)
শুকনো ইট বা ব্লকের ওপর সরাসরি প্লাস্টার দিলে ইট প্লাস্টারের পানি শুষে নেয়। ফলে প্লাস্টার দ্রুত শুকিয়ে ফেটে যায়। তাই কাজ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে দেয়ালে পর্যাপ্ত পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তবে পানি যেন দেয়াল বেয়ে গড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ডট বা স্ক্রিড তৈরি
পুরো দেয়াল সমান রাখার জন্য ছোট ছোট সিমেন্টের গোলা বা 'ডট' বসানো হয়। সুতা টেনে বা স্পিরিট লেভেল ব্যবহার করে এই ডটগুলোর উচ্চতা সমান করা হয়। এই ডটগুলোই প্লাস্টারের পুরুত্ব নির্ধারণ করে।
মিশ্রণ তৈরি ও প্রয়োগ
সিমেন্ট ও বালু শুকনো অবস্থায় মেপে ভালোভাবে মেশাতে হয়। এরপর পরিমাণমতো পানি দিয়ে এমনভাবে মাখতে হয় যেন মিশ্রণটি খুব বেশি পাতলা বা শক্ত না হয়। তৈরি করা মিশ্রণ ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে ব্যবহার শেষ করতে হয়।
প্লাস্টার সাধারণত নিচ থেকে ওপরের দিকে ট্রোয়েল (trowel) দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দেয়ালে ছুড়ে মারা (throwing) বা চেপে লাগানো, দুটি পদ্ধতিই প্রচলিত। তবে চেপে লাগালে ফাঁকা জায়গা কম থাকে।
মসৃণ করা (Finishing)
প্লাস্টার কিছুটা শক্ত হলে কাঠের বা অ্যালুমিনিয়ামের স্ট্রেট এজ (straight edge) দিয়ে সমান করা হয়। এরপর স্পঞ্জ বা ইস্পাতের ট্রোয়েল দিয়ে ঘষে মসৃণ করা হয়। ভেতরের দেয়ালে রং করার জন্য অত্যন্ত মসৃণ ফিনিশিং দরকার হয়, অন্যদিকে বাইরের দেয়ালে কিছুটা খসখসে (rough cast) রাখা হতে পারে।
কিউরিং (Curing)
প্লাস্টারের কাজ শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে ৭ দিন নিয়মিত পানি দিতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে কিউরিং বলে। কিউরিং না করলে সিমেন্ট পুরোপুরি শক্ত হয় না এবং প্লাস্টারে চুলের মতো ফাটল (hairline cracks) দেখা দেয়। বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালে পানি দ্রুত শুকিয়ে যায় বলে দিনে দুই থেকে তিনবার পানি দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
ভেতরের দেয়াল ও বাইরের দেয়ালের প্লাস্টারে পার্থক্য
ভেতরের এবং বাইরের দেয়ালের প্লাস্টারের কাজের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
ভেতরের দেয়ালের প্লাস্টারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মসৃণ পৃষ্ঠতল তৈরি করা, যাতে রং, ওয়ালপেপার বা টাইলস সহজে লাগানো যায়। এখানে সাধারণত ১২ মিলিমিটার পুরুত্বের প্লাস্টার যথেষ্ট। মিশ্রণে সিমেন্টের পরিমাণ তুলনামূলক কম রাখা যায়।
অন্যদিকে, বাইরের দেয়ালের প্লাস্টারকে রোদ, বৃষ্টি, ধুলোবালি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন সহ্য করতে হয়। তাই বাইরের দেয়ালে প্লাস্টারের পুরুত্ব ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার রাখা হয়। মিশ্রণে সিমেন্টের অনুপাত বেশি থাকে (১:৪)। অনেক সময় বাইরের দেয়ালে দুই স্তরে প্লাস্টার করা হয়। প্রথম স্তর (base coat) কিছুটা মোটা ও খসখসে রাখা হয়, আর দ্বিতীয় স্তর (finish coat) দিয়ে মসৃণ করা হয়।
সঠিক নকশা পরিকল্পনা থাকলে কোন দেয়ালে কতটুকু প্লাস্টার লাগবে তা আগে থেকেই হিসাব করা সহজ হয়।
বাংলাদেশের জলবায়ুতে প্লাস্টারের বিশেষ সতর্কতা
বাংলাদেশের জলবায়ু প্লাস্টারের কাজের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে প্লাস্টার শুকাতে অনেক সময় লাগে। ভেজা প্লাস্টারের ওপর দ্রুত রং করলে ভেতরের আর্দ্রতা আটকা পড়ে এবং পরে রং ফুলে উঠে বা ছত্রাক পড়ে। তাই বর্ষাকালে প্লাস্টারের কাজ করলে কিউরিং ও শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হয়।
গ্রীষ্মকালে তীব্র রোদে দেয়াল অতিরিক্ত গরম থাকে। এই অবস্থায় প্লাস্টার করলে মিশ্রণের পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়, ফলে প্লাস্টার দুর্বল হয়। গ্রীষ্মকালে সকালের দিকে বা বিকেলের দিকে প্লাস্টারের কাজ করা ভালো। কাজ শুরুর আগে দেয়ালে পর্যাপ্ত পানি ছিটিয়ে তাপমাত্রা কমানো জরুরি।
উপকূলীয় এলাকায় বাতাসে লবণের কণা থাকে। এই লবণ প্লাস্টারের ভেতর প্রবেশ করে আর্দ্রতা টেনে আনে, যাকে এফ্লোরেসেন্স (efflorescence) বা সাদা দাগ পড়া বলে। এসব এলাকায় সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের বদলে সালফেট প্রতিরোধী সিমেন্ট ব্যবহার করা ভালো।
প্লাস্টারের সাধারণ ত্রুটি ও সমাধান
সঠিক নিয়ম না মানলে প্লাস্টারে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যাগুলো আগে থেকে চিনে রাখলে এড়ানো সহজ হয়।
ফাটল ধরা: প্লাস্টারে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো ফাটল। মিশ্রণে অতিরিক্ত পানি দেওয়া, কিউরিং না করা, বা একবারে খুব মোটা আস্তরণ দেওয়ার কারণে ফাটল ধরে। ২০ মিলিমিটারের বেশি পুরু প্লাস্টার দরকার হলে দুই স্তরে কাজ করতে হয়।
প্লাস্টার খসে পড়া (Hollow sound): দেয়ালে টোকা দিলে যদি ভেতর থেকে ফাঁপা শব্দ আসে, তার মানে প্লাস্টার দেয়াল থেকে আলাদা হয়ে গেছে। দেয়াল পরিষ্কার না করা বা কাজের আগে দেয়ালে পানি না দেওয়ার কারণে এমন হয়। ছোট জায়গা হলে সেই অংশ ভেঙে নতুন করে প্লাস্টার করতে হয়।
সাদা দাগ পড়া: দেয়ালে সাদা লবণের দাগ পড়লে বুঝতে হবে প্লাস্টারের ভেতর দিয়ে আর্দ্রতা প্রবেশ করছে। বালুতে লবণ থাকলে বা দেয়ালের পেছন থেকে পানি আসলে এমন হয়। দাগ উঠিয়ে ওয়াটারপ্রুফ কোটিং দেওয়া যেতে পারে।
অসমান পৃষ্ঠতল: দক্ষ মিস্ত্রি না হলে বা সঠিকভাবে স্ক্রিড না বসালে প্লাস্টার ঢেউ খেলানো হয়। পরে রং করলে আলো পড়লে এই অসমান ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্লাস্টারের কাজের খরচ কেমন?
বাংলাদেশে প্লাস্টারের কাজের খরচ নির্ভর করে সিমেন্ট ও বালুর বর্তমান বাজারদর, শ্রমিকের মজুরি এবং কাজের পরিধির ওপর। খরচ সাধারণত বর্গফুট (sq ft) হিসাবে ধরা হয়।
খরচের একটি সাধারণ ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
- শ্রমিক খরচ (Labour cost): বর্তমানে বাংলাদেশে প্লাস্টারের শ্রমিক খরচ সাধারণত প্রতি বর্গফুটে ১৫ টাকা থেকে ৩০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। ভেতরের দেয়ালের তুলনায় বাইরের দেয়াল বা সিলিংয়ের কাজে শ্রমিক খরচ কিছুটা বেশি হয়।
- উপাদান খরচ (Material cost): সিমেন্ট ও বালুর দাম বাজার অনুযায়ী ওঠানামা করে। ১:৪ অনুপাতে প্লাস্টার করলে প্রতি বর্গফুটে উপাদানের খরচ শ্রমিক খরচের চেয়ে বেশি হয়।
- মোট খরচ: উপাদান ও শ্রমিক মিলিয়ে সাধারণ প্লাস্টারের কাজে প্রতি বর্গফুটে মোট খরচ আনুমানিক ৪০ টাকা থেকে ৭০ টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে এটি একটি সাধারণ হিসাব।
নির্মাণ ব্যয়ের সামগ্রিক হিসাব করার সময় প্লাস্টারের খরচ আলাদাভাবে উল্লেখ থাকে। PWD রেট বা সরকারি দর অনুযায়ী কাজ হলে খরচের কাঠামো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। আপনার প্রকল্পের সঠিক বাজেট জানতে নির্মাণ খরচের হিসাব করে নেওয়া সবচেয়ে ভালো।
দক্ষ শ্রমিক বা ঠিকাদার কীভাবে বেছে নেবেন?
প্লাস্টারের কাজ পুরোপুরি হাতের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। ভালো উপাদান ব্যবহার করলেও শ্রমিক দক্ষ না হলে ফলাফল খারাপ হবে। বাংলাদেশে প্লাস্টারের কাজ সাধারণত রাজমিস্ত্রিরা করে থাকেন।
ঠিকাদার বা মিস্ত্রি বেছে নেওয়ার সময় তাদের আগের কাজ দেখে নেওয়া উচিত। তারা দেয়ালের কোণা (corner) কতটা সোজা করতে পারে, পৃষ্ঠতল কতটা মসৃণ হয়, এবং স্ক্রিড বসানোর নিয়ম জানে কিনা তা যাচাই করুন। চুক্তি করার আগে স্পষ্টভাবে বলে দিন যে প্লাস্টারের পুরুত্ব কত হবে এবং কিউরিংয়ের দায়িত্ব কার থাকবে।
নির্ভরযোগ্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে, তবে ভালো ঠিকাদার পেলে প্লাস্টারের ত্রুটি অনেক কমে যায়। আবাসিক নির্মাণ প্রকল্পে প্লাস্টারের মান নিয়ন্ত্রণ একটি আলাদা পর্যবেক্ষণের বিষয়।
BNBC-তে প্লাস্টার সংক্রান্ত নির্দেশিকা
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) নির্মাণের প্রতিটি ধাপে কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। আবাসিক ভবনের জন্য BNBC মেনে চললে কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়। প্লাস্টারের ক্ষেত্রে BNBC মূলত উপাদানের মান এবং অগ্নি প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেয়।
প্লাস্টারে ব্যবহৃত সিমেন্ট অবশ্যই BSTI (Bangladesh Standards and Testing Institution) অনুমোদিত হতে হবে। বালুতে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা জৈব পদার্থ থাকা যাবে না। এছাড়া, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু দেয়ালে অগ্নি প্রতিরোধী (fire-resistant) প্লাস্টার ব্যবহারের নির্দেশনা থাকতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্লাস্টার শুকাতে কতদিন সময় লাগে?
প্লাস্টারের পৃষ্ঠতল শুকাতে সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে পুরোপুরি শক্ত হতে এবং রং করার উপযোগী হতে কমপক্ষে ৭ থেকে ১৪ দিন সময় দেওয়া উচিত। বর্ষাকালে এই সময় আরও বেশি লাগতে পারে।
পুরোনো দেয়ালে নতুন প্লাস্টার করা যায় কি?
হ্যাঁ, যায়। তবে পুরোনো প্লাস্টার যদি খসে গিয়ে থাকে বা ফাঁপা শব্দ হয়, সেই অংশ পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে হয়। এরপর পুরোনো দেয়াল ভালোভাবে পরিষ্কার করে, খসখসে করে এবং পানি দিয়ে ভিজিয়ে নতুন প্লাস্টার করতে হয়।
প্লাস্টারের আগে দেয়ালে প্রাইমার দেওয়া কি জরুরি?
ইটের দেয়ালে সাধারণত প্রাইমার লাগে না, তবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়াটাই যথেষ্ট। কিন্তু কংক্রিটের মসৃণ পৃষ্ঠে বা পুরোনো প্লাস্টারের ওপর নতুন প্লাস্টার করতে হলে বন্ডিং এজেন্ট (bonding agent) ব্যবহার করা ভালো, যাতে নতুন আস্তরণ পিছলে না যায়।
প্লাস্টারের পুরুত্ব কত হওয়া উচিত?
ভেতরের দেয়ালে সাধারণত ১২ মিলিমিটার এবং বাইরের দেয়ালে ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার পুরুত্ব আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। এর চেয়ে বেশি পুরু করতে হলে একাধিক স্তরে কাজ করতে হয়।
সিলিংয়ে প্লাস্টার খসে পড়লে কী করবেন?
সিলিংয়ের প্লাস্টার খসে পড়া বিপজ্জনক হতে পারে। এটি সাধারণত দুর্বল মিশ্রণ, অতিরিক্ত পুরুত্ব বা কিউরিং না করার কারণে হয়। খসে যাওয়া জায়গাটি পুরোপুরি পরিষ্কার করে, তারের জালি (wire mesh) ব্যবহার করে ১:৩ অনুপাতের শক্ত মিশ্রণে নতুন করে প্লাস্টার করতে হবে।
প্লাস্টারের কাজ বাড়ির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং সৌন্দর্যের ভিত্তি। সঠিক অনুপাতে মিশ্রণ তৈরি করা, অভিজ্ঞ শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো এবং নিয়মিত কিউরিং করা, এই তিনটি বিষয় ঠিক থাকলে প্লাস্টার বছরের পর বছর অক্ষত থাকে। নতুন বাড়ি তৈরি হোক বা পুরোনো বাড়ির সংস্কার, প্লাস্টারের মান নিয়ে আপস না করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।


